কামাল হোসেন জুয়েল:
তারেক আজিজ লিয়ন, কলেজ শিক্ষার্থী। তার নিকটাত্মীয় শাহ আলম খোকন (৫৫)। গ্রামের বাড়ী ভাদুর ইউনিয়নে। গত কয়েকদিন থেকে জ¦র ও শরীর ব্যথা নিয়ে শাহ আলম খোকনকে ভর্তি করা হয় রামগঞ্জ উপজেলা শহরের একটি বে-সরকারী হসপিটালে।
চিকিৎসাধীন অবস্থায় দেখা দেয় শ্বাসকষ্ট। অক্সিজেন সেচুরেশন দ্রুত নামতে থাকায় চিকিৎসক জানান উনাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য অক্সিজেন দিয়ে ঢাকায় নিতে হবে। এদিকে হসপিটালে অক্সিজেন নেই। একটা সিলিন্ডার জোগাড় করে দেড়ঘন্টায় বিল নেয়া হয় ৬শ টাকা। অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকায় নেয়ার সময় আরো একটি অক্সিজেন সিলিন্ডার ভাড়া নিতে হয় ২হাজার টাকায়। পথিমধ্যেই খালি হয়ে যায় অক্সিজেন সিলিন্ডারটি। ঢাকায় ৪ঘন্টার মতো অক্সিজেন ছাড়া বিভিন্ন হসপিটালের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছি। শেষ একটা হসপিটালের আইসিইউতে ভর্তি করা হলেও শেষ রক্ষা হলো না, আমার খালু শাহ আলম খোকন মারা যান। এভাবেই তারেক আজিজ লিয়ন জানান তার কষ্টের কথা। তিনি আরো জানান, শুধুমাত্র অক্সিজেনের অভাবেই তার খালু মারা গেছেন।

মোঃ টিপু জানান, আমার আত্মীয়া নুরজাহান বেগমের জন্য রামগঞ্জ ব্লাড ডোনার’স ক্লাব থেকে একটি সিলিন্ডার নিয়ে রোগীকে সেবা দেই। পরদিন অক্সিজেন শেষ হয়ে গেলে আমি স্থানীয় একটি অক্সিজেনের দোকান থেকে রিফিল করতে গেলে দোকানী আমার কাছ থেকে ১৫শ টাকা নিয়ে যায়। দোকানদার আমার পরিচিত হওয়ায় কিছু বলিনি।
একই অভিযোগ একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নুর নবীর। তিনি জানান, আমরা আগে ২শ টাকা দিয়ে ১২ লিটারের একটি সিলিন্ডার রিফিল করতাম। বৃহস্পতিবার বিকালে একই সিলিন্ডার ৫শ টাকা দিয়ে রিফিল করতে হয়েছে। এসময় তিনি জানান, কিছু করার নেই। যেখানে অক্সিজেনই সঙ্কট, সেখানে ৫শ টাকা দিয়ে হলেও তো পেয়েছি।

এদিকে রামগঞ্জ উপজেলায় অক্সিজেন সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের লোকজন। ঘন্টা পর পর ফোনে বিভিন্ন এলাকা থেকে অক্সিজেন সিলিন্ডারের জন্য আকুতি জানান ভুক্তভোগীরা। ভাই দয়া করুন, একটা সিলিন্ডার ব্যবস্থা করে দিন। আমার রোগীর অবস্থা খুবই খারাপ। এক সিলিন্ডার অক্সিজেনের জন্য রোগীর নিকটাত্মীয়রা হাহাকার করছেন।
রামগঞ্জ উপজেলার অক্সিজেন ব্যবসায়ী কোহিনুর এন্টারপ্রাইজের মালিক আবদুর রহমান জানান, আমরা ২শ টাকা করে প্রতি বোতল রিফিল করলেও এখন বাধ্য হয়ে একটু বেশি নিতে হচ্ছে। তার উপর রামগঞ্জ থেকে পিকআপে করে কুমিল্লার মেঘনা থেকে অক্সিজেন আনতে হয়। গাড়ীভাড়াসহ অক্সিজেন সিলিন্ডার ভর্তি করতে আগের থেকে দ্বিগুন খরছ হয়। বাধ্য হয়ে কিছু বেশি নিতেই হয়।

উপজেলার ডোননদী ব্লাড ডোনার ক্লাবের সভাপতি আলী হোসেন নয়ন জানান, রামগঞ্জ শহর থেকে আমাদের এ এলাকা প্রায় ৮ কিলোমিটার দুরে। গভীর রাতে হটাৎ করেই কল আসে ভাই একটা অক্সিজেন সিলিন্ডার ব্যবস্থা করে দিন। আমার মায়ের অবস্থা ভালো না, অক্সিজেন লেভেল ৮০/৮২। এত রাতে কোথায় যাবো। আমাদের কাছে ২টা সিলিন্ডার থাকলেও সেগুলো ছিলো অন্য রোগীদের কাছে। রাতেই ঐ রোগীকে রামগঞ্জ শহরের একটি হসপিটালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
রামগঞ্জ উপজেলার একটি বে-সরকারী হপিটালের মালিক জানান, আমাদের হসপিটালে একজন শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত রোগী আসলেও আমরা অতিরিক্ত রোগীর কারনে উনাকে অক্সিজেন সেবা দিতে পারিনি। ঐ রোগীর আত্মীয়রা বাধ্য হয়ে একটি অক্সিজেন দোকান থেকে সিলিন্ডারসহ ভাড়া নেয় আড়াই হাজার টাকায়। এটা অমানবিক।
রামগঞ্জ উপজেলা স্বেচ্ছাসেবী ঐক্য ফোরামের সভাপতি ও রামগঞ্জ ব্লাড ডোনার’স ক্লাবের সভাপতি মোঃ ফারুক হোসেন জানান, আমাদের কাছে ২১টি সিলিন্ডার থাকলেও একটিও আমাদের অফিসে নেই। সবগুলো বিভিন্ন রোগীর বাড়ীতে। এছাড়া উপজেলার বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের কাছে প্রায় অর্ধশত অক্সিজেন সিলিন্ডার থাকলেও সবগুলোই রোগীদের সেবায় নিয়োজিত রয়েছে। স্থানীয় সাংসদ ড. আনোয়ার হোসেন খাঁন গত বৃহস্পতিবার রামগঞ্জ উপজেলা স্থাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১০টি অক্সিজেন সিলিন্ডার ও ৫টি অক্সি-কনসানট্রেটর দিলেও তাতো হসপিটালের বাহিরে রোগীদের জন্য না। যারা হসপিটালে চিকিৎসা নিতে আসবেন, সেগুলো তাদের জন্যই।
রামগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডাক্তার রওশন জামিল ভূইয়া জানান, মানুষের জ¦র সর্দি কাশি হলে কিছুটা দূর্বল হবেই। এছাড়া করোনার ভয়ে অনেকের অক্সিজেন সিচুরেশন কমে যেতে পারে। আর রোগীর আত্মীয়রা অতিরিক্ত সাবধানতা অবলম্বন করতে গিয়ে অক্সিজেন সিলিন্ডার কিনে ঘরে রেখে দেয়। এতে করে প্রকৃত অক্সিজেন সেবাগ্রহীতারা পড়েন বিপাকে। অক্সিজেন না পেয়ে শারিরীকভাবে আরো অসুস্থ্য হয়ে পড়েন তারা।
রামগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাপ্তি চাকমা জানান, আমরা বিভিন্ন মাধ্যম থেকে খবর সংগ্রহ করেছি। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী অক্সিজেন নিয়ে মানুষের সাথে প্রতারনা করে আসছে বলে অভিযোগ পেয়েছি। অধিক মূল্যে বাধ্য করছে অক্সিজেন ক্রয়ে। বিষয়টি নিয়ে জেলা প্রশাসক মহোদয়ের সাথে কথা হয়েছে। আমরা কয়েকজনকে মৌখিকভাবে সাবধান করে দিয়েছি। এরপরও অতিরিক্ত দাম নেয়া হলেও ঐ প্রতিষ্ঠান সিলগালা করে দেয়া হবে।
জেলা প্রশাসক মোঃ আনোয়ার হোছাইন আকন্দ জানান, আমরা খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে জেলা পর্যায়ে প্রান্তিক পর্যায়ে অক্সিজেন সেবা দেয়ার জন্য সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলেছি। সপ্তাহের নির্ধারিত কয়েকদিন অক্সিজেন রিফিল করতে গাড়ী আসবে। পুরো জেলার যত অক্সিজেন সিলিন্ডার আছে, তা এখান থেকে রিফিল করা হবে। আর যদি কোন ব্যক্তির অক্সিজেন কেনার সাধ্য না থাকে, তাহলে আমরা সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী অফিসারদের সাথে কথা বলে বিনামূল্যে অক্সিজেন সেবা প্রদান করবো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!